রবিবার, ০৯ মে ২০২১, ০১:৫২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
শিরোনাম :
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ‘৩৩৩’ এ ফোন পেয়ে খাবার নিয়ে গেল ইউএনও রাজীবুল ইসলাম খান করোনার কারনে পালিত হচ্ছেনা বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের ২৫ শে বৈশাখে ১৬০ তম জন্মজয়ন্তী কুষ্টিয়ার কুমারখালী হতদরিদ্রের জন্য বিনামূল্যে মিলছে ঈদ বস্ত্র গেমেস’র নেশায় আসক্ত হয়ে ধ্বংস হচ্ছে হাজারো যুবক বকচরায় মৎস্য ঘের থেকে যুবকের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার টাঙ্গাইলে র‍্যাবের অভিযানে গাঁজাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার কেমন আছেন সাতক্ষীরার ইত্যাদি খ্যাত চুল দিয়ে গাড়ি টানা যুবক আব্দুস সবুর কুমারখালীর শ্রমিকরা পেল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ নাগরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত কুমিল্লা মুরাদনগরে উপজেলায় পথচারীদের মাঝে যুবলীগের ইফতার বিতরণ

কোরআন ও হাদিসের আলোকে আজ পবিত্র লাইলাতুল বারাত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫০ বার পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১, ১১:২০ পূর্বাহ্ন

বিদ্রোহী চোখ ডেস্ক রিপোর্টঃকোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রবিত্র লাইলাতুল বরাত। বিশ্বের মুসলমানদের কাছে পবিত্র শবে বারাত অত্যান্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি রাত।২৯ মার্চ সোমবার দিবাগত রাত পবিত্র লাইলাতুল বরাত। আরবি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে লাইলাতুল বরাত কিংবা শবেবরাত বলে। মুসলমানদের জন্য পবিত্র শা’বান মাস অত্যান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ মাসের ১৫ তারিখের রাত তাৎপর্য কুরআন, সুন্নাহ ও ফোকাহায়ে কিরামের অভিমত দ্বারা প্রমাণিত একটি মহিমান্বিত রজনী। ‘লাইলাতুল বরাত’ বা শবে বরাত উদযাপনের ভিত্তি ও তাৎপর্য পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ্ ও ফোকাহায়ে কিরামের সুস্পষ্ট অভিমত রয়েছে। তারপরও পবিত্র শবে বারাত নিয়ে অনেকের-অনেক মন্তব্য রয়েছে। কোরআন ও হাদিসের নিরিখে সকলের খেদমতে তা পেশ করা হলো।

‘শবে বরাত’ মুসলমানদের মর্যাদাপূর্ণ পাঁচটি রাতের মধ্যে একটি। এ রাত ইবাদতের রাত হিসেবে রাসুল (সা.)’র যুগ থেকে স্বীকৃত হয়ে আসছে। এ রাত স্বয়ং রাসুল (সা.) পালন করেছেন। তাই এ রাতে ইখলাছের সাথে আমল করা অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ।

حم ﴿১﴾ وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ ﴿২﴾ إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ ﴿৩﴾ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ﴿৪﴾ (الدخان: ১-৪)

পবিত্র কুরআনের মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন- হা-মিম। ‘নিশ্চয় আমি এটি(কুরআন মাজিদ) নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে, অবশ্য আমি সতর্ককারী। সেই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজের ফয়সালা হয়।’(সূরা আদ-দুখান-৪)
এ আয়াতখানা ‘শবে বরাত’র মর্যাদা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। এটি প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত ইকরামাহ (রা:)সহ এক দল মুফাস্সিরীনে কিরামের অভিমত। সকল তাফসীরকারক এ মতটি তাঁদের স্বীয় তাফসীরে উল্লেখ করেছেন।
তাঁদের অভিমত থেকে বোঝা যায় যে, ‘লাইলাতুল বরাতের’ কথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে। (ইমাম কুরতুবী,তাফসীরে কুরতুবী,দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, মিশর, ২য় সংস্করণ, ১৩৮৪ হি:, খ. ১৬, পৃ: ১২৬; ইমাম খাযেন,তাফসীরে খাযেন, দারুল ফিকর বৈরুত, ১৩৯৯ হিজরী, খ: ৬, পৃ: ১৪৩; ইমাম বগভী, তাফসীবে বগভী, দারুল তাইয়িবাহ লিন- নশর ওয়াত্ তাওযীহ, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪১৭ হিজরী, খ: ৭, পৃ: ২২৮)
হযরত ইবন আব্বাস, হযরত কাতাদাহ্, হযরত ইবন জুবাইর, হযরত মুজাহিদ, হযরত যাইদ, হযরত হাসান বসরি (রা।) সহ জমহুর উলামায়ে কিরামের মতে এ আয়াত লাইলাতুল কদর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।
(ইমাম আলূসি, রুহুল মায়ানি, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ্, বৈরুত, ১ম সংস্করণ, ১৪১৫হি, খ.১৩,পৃ.১১০; ইমাম কুরতুবি, প্রাগুক্ত) এটিই অধিকতর নির্ভরযোগ্য বর্ণনা।
১. তাফসীরে জালালাইন শরীফে ৪১০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে-
ان انزلناه فى ليلة مباركة هى ليلة القدر او ليلة النصف من شعبان نزل فيها من ام الكتاب من السماء السابعة الى السماء الدنيا انا كنا منذرين-
নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর বরকতময় রাত হল লাইলাতুল ক্বদর (ক্বদরের রাত) অথবা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (শাবানের মধ্য রাত তথা শবে বরাত)। কেননা এই রাতে উম্মুল কিতাব (কোরআন শরীফ) ৭ম আসমান থেকে দুনিয়ার আসমানে (১ম আসমান) নাযিল হয়েছে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।
২. তাফসীরে তাবারী শরীফ পৃষ্ঠা-২২, খন্ড ১০ -এ বর্ণিত আছে-
عن محمد بن سوفة, عن عكرمة فى قول الله تبارك وتعالى (فيها يفرق كل أمر حكيم) قال: فى ليلة النصف من شعبان يبرم فيها أمر السنة وتنسخ الأحياء من الأموات ويكتب الحاج فلا يزاد فيهم أحد, ولا ينقص منهم أحد.
كذا أخرج ابن جرير وابن منذر وابن أبى حاتم وكذا فى روح المعانى-
আল্লাহ তায়ালার বাণী فيها يفرق كل أمر حكيم এর তাফসীরে বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইকরামা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মধ্য শাবানের রাত্রিতে বছরের সকল ব্যাপার চূড়ান্ত করা হয়, জীবিত ও মৃতদের তালিকা লেখা হয় এবং হাজীদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা থেকে একজনও কমবেশি হয় না।

অনুরূপ বর্ণনা করেছেন ইবনুল মুনজির ও ইবনু আবি হাতেম (রা:)। এরূপ রুহুল মায়ানীতেও আছে।
৩. তাফসীরে কুরতুবী পৃষ্ঠা-১২৬, খন্ড ১৬ এ বর্ণিত আছে :
ولها أربعة أسماء: الليلة المباركة, وليلة البراءة, وليلة الصك, وليلة النصف من شعبان-
ইমাম কুরতুবী (রা:) বলেন, এ রাতের ৪ টি নাম আছে-
ক. লাইলাতুম মুবারাকা, খ.লাইলাতুল বারাআত
গ. লাইলাতুছ্ ছাক, ঘ. লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান।

৪. তাফসীরে বাগভী পৃষ্ঠা-২২৮, খন্ড ৭ -এ বর্ণিত আছে :
عن ابن عباس رضى الله عنهما أن الله يقضى الأقضية فى ليلة النصف من شعبان, ويسلمها إلى أربابها فى ليلة القدر-
নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা করেন শবে বরাতের রাতে এবং তা সংশ্লিষ্ঠ দায়িত্ববান ফেরেস্তাদের কাছে ন্যস্ত করেন শবে ক্বদরের রাতে।

হাদিসের আলোকে
—————-
‘শবে বরাত’ উদ্যাপন ও তাৎপর্য সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস শরিফ বর্ণিত রয়েছে।
হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন শা’বান মাসের পনের তারিখ উপনীত হলে তোমরা ইবাদতের মাধ্যমে রাত উদ্যাপন কর এবং দিনে রোযা রাখ। কেননা, মহান রাব্বুল আলামীন সূর্য অস্তমিত হবার পর প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়ে বলেন, ক্ষমা প্রার্থনা করার কে আছে, যাকে আমি ক্ষমা করব? রিযিক প্রার্থনা করার কে আছে, যাকে আমি রিযিক প্রদান করব? কে বিপদগ্রস্ত আছে, যাকে আমি বিপদ মুক্ত করব? এভাবে ফজর পর্যন্ত বিভিন্ন কিছু প্রার্থনার জন্য আহ্বান করতে থাকবেন।’ (ইমাম ইবনু মাজাহ)

উল্লেখ্য হাদিস শরিফে বর্ণিত ‘আল্লাহতায়ালা প্রথম আকাশে অবতরণ করেন’ এর মর্মার্থ হচ্ছে শবে বরাতের রাতে আল্লাহতায়ালা আপন বান্দাদেরকে অতীব নৈকট্য প্রদান করেন। (মুল্লা আলি কারি, মিরকাত, দারুল)

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- ‘আমি এক রাত রাসুল (সা.)কে ঘরে পাইনি। অতঃপর আমি ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁকে জান্নাতুল বক্বীতে পেয়েছি। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি ভয় কর যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) তোমার উপর অন্যায় করবেন?
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! মূলত তা-ই নয়; বরং আমি মনে করেছি যে আপনি আপনার কোন স্ত্রীর নিকট এসেছেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ শা’বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত কুদরতিভাবে প্রথম আসমানে আসেন আর ‘কাল্ব’ নামক গোত্রের ছাগলের সমুদয় পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক ব্যক্তিদেরকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইমাম তিরমিযী, আল-জামেঈ আস-সহীহ, দারু)

লাইলাতুল বরাতের নামকরণ
================
‘লাইলাতুল বরাতের’ বেশ কয়েকটি নাম রয়েছে। এটি বিভিন্ন কিতাবে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন হাদিস শরিফে এটি ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শা’বান’ নামে এসেছে। মুহাদ্দিসিনে কিরাম, মুফাস্সিরিনে ইজাম এবং ফুকাহায়ে কিরামসহ অন্যান্যদের নিকট বিভিন্ন নামে পরিচিত। আবার স্থানভেদে এর পরিচিতির ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন উপমহাদেশে এটি ‘শবে বরাত’ নামে অধিক পরিচিত। তবে ‘লাইলাতুল বরাত’ নামটিও অধিকাংশ মানুষ জানে। ‘লাইলাতুল বরাতের’ কতিপয় নাম হল-

১) ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ তথা বরকতময় রাত; কেননা এতে নেককারদের ওপর অধিক পরিমাণে বরকত অবতীর্ণ হয়। এ বরকত ‘আরশ’ থেকে ‘তাহ্তাস্ সারা’ পর্যন্ত পৌঁছে।
২) ‘লাইলাতুর রহমত’ বা রহমতের রাত, কেননা এ রাতে আল্লাহ বিশেষ রহমত অবতীর্ণ হয়।
৩) ‘লাইলাতুল বরাত’ বা মুক্তির রাত, কেননা এ রাতে মুমিন ব্যক্তির মুক্তি লেখা হয় এবং অসংখ্য জাহান্নামীদের মুক্তি দেয়া হয়।
৫) লাইলাতুল ক্বিস্মাহ ওয়াত্-তাক্বদীর বা বন্টনের রাত; কেননা, এ রাতে মানুষের রিযিক বণ্টন করা হয়।
৬) ‘লাইলাতুর তাগফীর’ বা ক্ষমার রাত। ইমাম সবুকী বলেন, এ রাতে অপরাধীদের অপরাধ ক্ষমা করা হয়।

৭) ‘লাইলাতুল ইজাবা’ বা দোয়া কবুলের রাত, কেননা এ রাতে দোয়া কবুল হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন ওমর (রা:) বলেন, এ রাতটি দোয়া কবুল হয় এমন পাঁচ রাতের একটি।
৮) ‘লাইলাতুল হায়াত’ বা হায়াতের রাত।
৯) ‘লাইলাতু ঈদিল মালায়িকা’ বা ফেরেশতাদের খুশির রাত; কেননা এটি ফেরেশতাদের দুটি ঈদের একটি।
১০) ‘লাইলাতুত্-তাজীম’ বা সম্মানিত রাত। (শাইখ সালিম সনহুরী, ফাদায়িলু লাইলাতি নিস্ফি শাহরি শাবান)

লাইলাতুল বরাত উদ্যাপন
==============
‘লাইলাতুল বরাতের রাতটি তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কারণে নবী করিম (সা:) নিজেই ইবাদতের মাধ্যমে এ রাত উদ্যাপন করেছেন। যেমন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বলেন- রাসুল (সা:) এ রাতে নামায পড়ছিলেন এবং সিজদায় দীর্ঘ অবস্থানের কারণে আমি মনে করলাম যে, তিনি ইনতেকাল করেছেন। তাঁর অবস্থা জানার জন্য আমি তাঁকে নাড়া দিলে তিনি নড়ে উঠেন এবং আমি তাঁকে সিজদায় বলতে শুনেছি “হে আল্লাহ , আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে আপনার শাস্তি থেকে পানাহ চাই, আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার রাগ থেকে আশ্রয় চাই আর আপনার যথাযথ প্রশংসা আমি করতে পারব না; এজন্য আমি আপনার সেই প্রশংসা করছি, যা আপনি আপনার জন্য করেছেন। এরপর সিজদাহ থেকে মাথা উত্তোলন করেছেন। অতঃপর নামায শেষ করে আমাকে বললেন, হে আয়েশা, আল্লাহর রাসুল (সা:) কি, তোমার সাথে কোন ধরণের খিয়ানত করেছেন? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ করে বলছি, এ ধরণের কোন কিছু নয়; বরং সিজদায় আপনাকে দীর্ঘকাল অবস্থানের কারণে আমি মনে করেছি যে, আপনি ইনতেকাল করেছেন। এ কথা শুনে তিনি বললেন, তুমি কি জান না এটি বরাতের রাত ? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন। এরপর তিনি বললেন, আজ ‘শাবান মাসের পনের তারিখ। এ রাতে মহান রাব্বুল আলামীন ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন। রহমত প্রার্থনাকারীদের রহমত প্রদান করেন এবং বিদ্বেষীদের অবকাশ দেন।”(ইমাম বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান)

হযরত মুয়ায বিন জাবাল (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসুল (সা:) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি চন্দ্র বছরের পাঁচটি রাত তথা শাবান মাসের পনের তারিখের রাত, ঈদুল ফিতরের রাত, ঈদুল আযহার রাত, আরাফার রাত এবং জিলহাজ্ব মাসের আট তারিখ রাত উদ্যাপন করবে, সেই জান্নাতের হক্বদার হবে যাবে।”(আব্দুল আজীম আল-মুনাভী)

হযরত কাসীর বিন দীনার থেকে বর্ণিত। রাসুল (সা:) ইরশাদ করেছেন- “যে ব্যক্তি সওয়াবের নিয়তে শা’বান মাসের ১৫ তারিখের রাত তথা লাইলাতুল বরাত এবং দুই ঈদের দুই রাত উদ্যাপন করবে, তাঁর অন্তর মরার দিনেও মরবে না।”(ইবনু নুজাইম,আল-বাহরুর রায়েক্ব, কিতাবুস সালাত, দারু ইহইয়ায়িত্ তুরাসিল আরবি)
এভাবে রাসুল (সা:) নিজে এই রাত উদ্যাপন করে স্বীয় উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা এ রাতে নামায আদায় কর,আল্লাহকে স্মরণ কর এবং দিনে রোযা রাখ।

উল্লেখিত হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা গেল যে, ‘শবে বরাত’ ইবাদতের মাধ্যমে উদ্যাপনের অনুমতি রয়েছে। রাসুল (সা:) থেকে পাওয়া যায় এবং এটি নব প্রচলিত কোন কিছু নয়।

‘লাইলাতুল বরাত’ উদ্যাপনে ফোকাহায়ে কিরামের অভিমত
ইবাদতের মাধ্যমে লাইলাতুল বরাত উদ্যাপনে ফোকাহায়ে কিরামের অভিমত নি¤েœ উল্লেখ করা হল।

ফকীহগণের অভিমত
===========
১। প্রখ্যাত ফকীহ ইবনু নুজাইম হানাফী আলাইহির রাহমাহ বলেন- “শা’বান মাসের পনের তারিখ,যিল হজ্জের দশ তারিখ,দু’ঈদের দু’রাত এবং রমজান মাসের শেষ দশ রাত রাত জেগে ইবাদত করা মুস্তাহাব। কেননা এ ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত রয়েছে। আল্লামা আব্দুল আজীম আল-মুনাভী স্বীয় কিতাব ‘আত্-তারগিব ওয়াত তারহিব’ গ্রন্থে এ সকল হাদিস শরিফ বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
এখানে ‘উদযাপন করা’ অর্থ হলো সারা রাত জেগে ইবাদত করা।” (ইবনু নুজাইম,আল-বাহরুর রায়েক্ব, কিতাবুস সালাত, দারু ইহইয়ায়িত্ তুরাসিল আরবি)

২। প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা ইবন আবেদীন শামী বলেন, “নির্দিষ্ট সংখ্যার হিসাব না করে একাকি নফল নামায আদায় করা, কুরআন-হাদিস পাঠ ও শ্রবণ করা, তাসবিহ, আল্লাহর প্রশংসা এবং নবীর ওপর দরূদ শরিফ পাঠের মাধ্যমে লাইলাতুল বরাত উদ্যাপন করা হয়ে থাকে।”(ইবন আবেদীন শামী, রাদ্দুল মুহতার, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৪২১ হিজরী, খ. ২য়, পৃ: ২৬)

৩। ইমাম হাসান শুরুনবুলালি (র:)বলেন- “লাইলাতুল বরাত উদ্যাপন করা মুস্তাহাব। কেননা এ রাত অত্যান্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এ রাতে রিযিক বন্টন করা হয় আর মৃত্যু নির্ধারণ করা হয়।”(ইমাম হাসান শুরুনবুলালি, মারাকিল ফালাহ,আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ,বৈরুতত, ১৪২৫হি,খ.১,পৃ.৭৩)

৪। ইমাম শাফিঈ (র:) বলেন- “বছরের পাঁচটি রাতে দোয়া কবুল হয়। এগুলো হল শুক্রবারের রাত(বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত), দুই ঈদের দুই রাত, রজব মাসের প্রথম রাত এবং শাবান মাসের পনের তারিখের রাত। এ রাতগুলো সম্পর্কে আমি যা বর্ণনা করেছি, তা আমি পছন্দ করি।”(ইমাম শাফি,কিতাবুল উম,দারুল ফিকর, বৈরুত, ১ম সংস্করণ)

৫. ফকীহ মনসুর বিন ইউনুস বুহুতী হাম্বলী বলেন- “শাবান মাসের পনের তারিখ কিয়ামুল লাইল তথা ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করা মুস্তাহাব।”(ইমাম বহুতী, কাশফুল ক্বিনা, দারুল ফিকর, বৈরুত)

৬. আল্লামা রুহায়বানী হাম্বলী বলেন- “শাবান মাসের পনের তারিখ রাত ঈদের রাতের মত কিয়ামুল লাইল তথা ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করা মুস্তাহাব।”(রুহায়বানী, মাতালিবু উলির নেহী, আলমাকতাবাতুল ইসলামী, দামেস্ক)

৭. গাউসুল আজম আব্দুল কাদের জিলানি (র:) বলেন- “কতিপয় আলেম ওই চৌদ্দটি রাতকে একত্রে করে লিখেছেন,যেগুলোকে ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করা মুস্তাহাব।
গাউসূল আজম বড় পীর শেখ সৈয়্যদ আবূ মুহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী (র:) তদ্বীয় কিতাব “গুনিয়াতুত্ত্বালেবীন” এর ১ম খন্ডে-এ ৬৮৪ পৃষ্টায় উল্লেখ করেন-
قال الله عز وجل حم والكتاب المبين انا انزلناه فى ليلة مباركة قال ابن عباس رضى الله عنهما حم قضى الله ما هو كائن الى يوم القيمة والكتاب المبين يعنى القران- انا انزلناه يعنى القران فى ليلة مباركة هى ليلة النصف من شعبان وهى ليلة البرأة وقال ذالك اكثر المفسرين-
অর্থাৎ:- আল্লাহ পাক এরশাদ করেন- হা-মী-ম প্রকাশ্য মহাগ্রন্থ আল কোরআনের শপথ- যে কোরআনকে আমি মুবারক (বরকতময়) রাতে নাযিল করেছি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) এর তাফসীর প্রসংগে বলেন- কিয়ামত পর্যন্ত যা হওয়ার আছে- তা আল্লাহ পাক ফয়সালা করে দিয়েছেন। শপথ উজ্জল প্রকাশ্য গ্রন্থ তথা কোরআনের যাকে আমি বরকতময় রাতে অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রজনীতে নাযিল করেছি- ঐ ১৫ শাবানের রাতটি হচ্ছে লাইলাতুল বরাআত- এবং অধিকাংশ মোফাসসিরীনে কেরাম এ মত পোষন করেছেন।

তিনি বলেন- এ রাতগুলোর সংখ্যা হচ্ছে বছরে চৌদ্দটি।
এগুলো হল-১.মুর্হারাম মাসের ১ম রাত
২.আশুরার রাত(মুহাররাম মাসের ১০ম রাত)
৩.রজব মাসের ১ম রাত
৪.রজব মাসের ১৫ তারিখের রাত
৫.রজব মাসের ২৭ তারিখের রাত(শবে মি’রাজ)
৬.শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত তথা শবে বরাত
৭.আরাফাতের রাত(৯ যিলহজ্ব’র রাত)
৮.ঈদুল ফিতরের রাত
৯.ঈদুল আযহার রাত
১০-১৪.রমজান মাসের শেষ দশ দিনের বেজোড় পাঁচ রাত।”(ইমাম আব্দুল কাদের জিলানি,গুনইয়াতুত তালেবিন(আল-গুনইয়াতু লিতালিবি তরিক্বিল হক্ব,দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ,বৈরুত)

৮. ইবন রজব হাম্বলীর মতেও এ রাতে ইবাদত করা মুস্তাহাব। এ রাতে রাসুল (সা:) পরিপূর্ণ রাত ইবাদত করতেন।( ইবনু রজব হাম্বলি,প্রাগুক্ত,পৃ.১৩৮)

৯. আল্লামা ইবনুল হাজ্ব মালেকী বলেন- “শাবান মাসের পনের তারিখের রাতটি যদিও লাইলাতুল কদর নয়, তথাপি অত্যাধিক সম্মানিত ও বরকতময়। সলফে সালেহীনরা এ রাতকে খুব সম্মান করতেন এবং এ রাত আগমণ করার পূর্বে এর
জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। আগমনের পর শরিয়ত সমর্থিত বিষয়ের মাধ্যমে এর সম্মান করতেন।”(ইবনুল হাজ্ব মালেকী, আল-মাদহাল, দারুল ফিকর,১৪০১ হিজরী, খ: ১ম, পৃ: ২৯৯)

১০.মিশর দারুল ইফতার ফতোয়া- ‘লাইলাতুল বরাত সম্পর্কে মিশর দারুল ইফতার ফতোয়াটি সুদীর্ঘ যার মূল বক্তব্য উল্লেখ করা হল।
লাইলাতুল বরাত সম্পর্কে তথা এর গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে যার মধ্যে কিছু হল সহিহ আর কিছু যয়ীফ। উলামাগণ ‘যয়ীফ হাদিস’ এর উপর আমল করার বৈধতা দিয়েছেন। রাসুল (সা:) লাইলাতুল বরাতে নামায পড়তেন; কিন্তু তাঁর রাত্রি জাগরণের বিষয়টি নজরে না পড়ার কারণ হল তিনি প্রায় রাত জেগে নামায পড়তেন। তাঁর লাইলাতুল বরাত পালনটি ছিল ব্যক্তিগত, সম্মিলিতভাবে নয়। বর্তমানে যেভাবে সবাই সম্মিলিতভাবে এ রাত উদযাপন করে, তা তাঁর যুগে এবং সাহাবায়ে কিরামের যুগে ছিল না; তবে এটি তাবেয়ীনদের যুগে শুরু হয়েছিল। এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করার ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই; তবে মসজিদে সম্মিলিতভাবে পড়বে, না-কি ঘরে একাকী পড়বে এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। এ মতবিরোধের যে কোন একটি অভিমতের উপর আমল করা যাবে। অর্থাৎ সম্মিলিতভাবে মসজিদেও নামায পড়া যাবে অথবা একাকী ঘরেও নামায পড়া যাবে।( ফাতায়ায়ে দারুল ইফতা আল মিসরিয়্যাহ, ওযারাতুল আওকাফিল মিসরিয়্যাহ, মিশর, ১৯৯৭ইং, খ: ১০ম, পৃ: ১৩১)

১১.কুয়েত সরকারের ফতোয়া : ‘কুয়েত সরকারের ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত বিশ্বকোষ তথা ইসলামিক বিশ্বকোষে রয়েছে- “শাবান মাসের পনের তারিখ রাত উদযাপন করার ক্ষেত্রে সকল ফকীহ একমত। তাঁদের মতে এ রাত উদ্যাপন করা মুস্তাহাব। কেননা রাসুল (সা:) ইরশাদ করেছেন , এ রাতে তোমরা কিয়ামুল লাইল তথা ইবাদতের মাধ্যমে আর দিনে রোযা রাখার মাধ্যমে পালন কর।”(সম্পাদনা পরিষদ,আল-মুসুয়াত ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ওয়ারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনুল ইসলামী, কুয়েত, ২য় সংস্করণ)

১২.দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া : “এ রাত অত্যান্ত ফযিলতপূর্ণ। এ রাতে একাকী নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা, যিকির করা, কবর যিয়ারত করা, দোয়া এবং ক্ষমা চাওয়া মুস্তাহাব। তবে সম্মিলিতভাবে মসজিদে নয়।”(ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ,ভারত,খ.১,পৃ.১০২ ও ২৯৩)
তারা মূলত দিতীয় অভিমতের উপর ফতোয়া দিয়েছেন ।

১৩. মাওলানা আশরাফ আলী থানভী বলেন, ‘১৫ শাবান রাত জেগে ইবাদত করা উত্তম; প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক।’
১৪. আব্দুল হাই লাকনভী বলেন- “লাইলাতুল বরাতে জাগ্রত থেকে ইবাদতে মশগুল থাকার ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।
এ ব্যাপারে ইমাম ইবন মাজাহ এবং ইমাম বায়হাকি হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা:) করেছেন-“শা’বান মাসের পনের তারিখ উপনীত হলে তোমরা ইবাদতের মাধ্যমে রাত উদযাপন কর এবং দিনে রোযা রাখ। কেননা, মহান রাব্বুল আলামীন সূর্য অস্তমিত হবার পর প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়ে বলেন, ক্ষমা প্রার্থনা করার কে আছে, যাকে আমি ক্ষমা করব? রিযিক প্রার্থনা করার কে আছে, যাকে আমি রিযিক প্রদান করব? কে বিপদগ্রস্থ আছে, যাকে আমি বিপদ মুক্ত করব? এভাবে ফজর পর্যন্ত বিভিন্ন কিছু প্রার্থনার জন্য আহ্বান করতে থাকবেন।”.
.. উল্লেখিত বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, রাসুল (সা:) সেই রাতে অধিক ইবাদত,দুয়া,কবর যিয়ারত এবং মৃতদের জন্য দুয়া করতেন। সকল প্রকার হাদিসে কাওলি এবং হাদিসে ফে’লি দ্বারা ঐ রাতে অধিক পরিমাণে ইবাদত করা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়েছে। নামায বা অন্য ইবাদত করার ব্যাপারে সে স্বাধীন। যদি নামায পড়াকে সে গুরুত্ব দেয়, তাহলে সে যত রাকাত ইচ্ছা পড়তে পারবে। যে বিষয় নিষেধ হবার ব্যাপারে রাসূলের কোন নির্দেশ সরাসরি কিংবা ইঙ্গিতে রয়েছে, তা অবশ্য বর্জনীয়।”(আব্দুল হাই লকনবী, আল-আছারুল মারফুয়াহ, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, খ. ১ম পৃ: ৮১-৮২)

১৫. লামাযহাবীদের নির্ভরযোগ্য শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী বলেন- “শাবান মাসের পনের তারিখের রাতের ফযিলত সম্পর্কে অসংখ্য শুদ্ধ হাদিস রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে এ রাতের মর্যাদা বোঝা যায়। সলফে সালেহীনগণ এ রাতে নামাজ পড়ার জন্য নির্ধারণ করে রাখতেন এবং দিনে রোজা রাখতেন। কেননা এ ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদিস রয়েছে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তীকালের কিছু আলেম এ রাতের মর্যাদাকে অস্বীকার করেছে এবং সহীহ হাদিসের ওপর অপবাদ দিয়েছে। কিন্তু আমাদের হাম্বলী মাযহাবসহ অন্যান্য মাযহাবের অধিকাংশ আলেমদের মতে এ রাতটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল এর মতও এটি। কেননা এ ব্যাপারে অসংখ্য হাদিস শরিফ রয়েছে।”(ইমাম ইবন তাইমিয়া,ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম,দারু আলামিন কুতুব,বৈরুত,৭ম সংস্করণ,১৪১৯হি,খ.২,পৃ.৯৭)
১৬.লামাযাহাবিদের অতি প্রিয় ও নির্ভযোগ্য ইমাম নাসিরুদ্দিন আলবানি স্বীয় কিতাব “সিলসিলাতুল আহাদীসিল সহিহা” গ্রন্থে লাইলাতুল বরাত সম্পর্কিত অনেক হাদিস উল্লেখ করে: এগুলোর মান যাচাই করার পর বলেন- “সার কথা হল (হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) থেকে বর্ণিত উপরিউক্ত) হাদিস শরিফটি (বর্ণিত) সকল সূত্রের সমন্বয়ে নি:সন্দেহে সহিহ। হাদিস অতিশয় দুর্বল না হলে আরো কম সংখ্যাক সূত্রে বর্ণিত হাদিস দ্বারা হাদিসের বিশুদ্ধতা প্রমাাণিত হয় তথা কোন দুর্বল হাদিসও অন্য সূত্রের কারণে সহিহ হয়ে যায় যেমন এ হাদিসে(শবে বরাত বিষয়ে হযরত আয়েশ সিদ্দিকা রা: থেকে বর্ণিত ) হয়েছে। শাইখ কাসেমি তাঁর ‘ইসলাহুল মাসাজিদ’ গ্রন্থের ১০৭ পৃষ্ঠায় হাদিস বিশারদগণের উদ্ধৃতিতে লিখেছেন যে, ‘শবে বরাতের ফযিলত সম্পর্কে কোন সহিহ হাদিস নেই।’ তাঁর এ কথার ওপর আস্থা রাখা উচিত নয়। আর যদি তাঁদের থেকে কেউ এ কথা বলেও ফেলে,তাহলে বুঝতে হবে যে,চিন্তা-ভাবনা ছাড়া অতি তাড়াহুড়া হেতু এবং বর্তমান পদ্ধতির ন্যায় হাদিসের বিভিন্ন সূত্র অন্বেষণের প্রচেষ্টা সীমিত হবার কারণেই এমনটা হয়েছে। মহান আল্লাহই তাওফিকদাতা।”(নাসিরুদ্দিন আলবানি,‘সিলসিলাতুল আহাদীসিল সহিহা’,দারুল মায়ারিফ,রিয়াদ,খ.৩,পৃ.২১৮)

অনুরূপভাবে এ মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত তথা শবে বরাত সম্পর্কে ছিহাহ্ ছিত্তাহর উল্লেখযোগ্য কিতাবাদিসহ নানা নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে প্রমাণ মেলে:

দলীল
======
দলীল নং-০১
عن ابى موسى الاشعارى عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ان الله تعالى ليطلع فى ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه الا لمشرك او مشاحن )رواه ابن ماجه (
হযরত আবূ মূসা আশয়ারী (রা:) রাসূলে কারীম (সা:) হতে বর্ণনা করেন। রাসূলে পাক (সা:) এরশাদ ফরমান- মধ্য শাবানের রাত্রিতে আল্লাহপাক রহমতের তাজাল্লী ফরমান এবং তার সমস্ত বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রুতা পোষণকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না। (ইবনে মাজাহ শরীফ পৃ. ১০০ হাদীস নং-১৩৮৯, মিশকাত শরীফ-১১৫ পৃষ্ঠা)

এছাড়াও হাদীসটি যেসব গ্রন্থে বর্ণিত আছে-
ইমাম বায়হাকী (র:) “শুয়াবুল ঈমান ৩ য় খন্ড পৃ. ৩৮২, “ফাজায়েলুল আওকাত” এর পৃ.-১৩৩, হাদীস নং-২৯। “মিসবাহুজ জুজাযাহ” এর ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৪৪২ হাদীস নং-৪৮৭, “আত তারগীব ওয়াত তারহীব” এর ৩য় খন্ড, হাদীস নং-২৭১৮। আহলে হাদীস তথা লা-মাযহাবীদের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নাসির উদ্দীন আলবানীর “সিলসিলাতুল আহাদিছে ছহিহা” এর ৩য়-খন্ড, ১৩১ পৃষ্ঠাসহ আরো ৫ টি হাদীস রয়েছে।
আল্লামা শেখ আবদুল হক মোহাদ্দেস দেহলভী (রা:) এ ধরনের কতিপয় হাদীস শরীফ উল্লেখপূর্বক তদ্বীয় মা-ছাবাতা বিচ্ছুন্নাহ কিতাবের ৩৫৪ পৃষ্ঠায় মুশাহিন শব্দের ব্যাখ্যায় লিখেন-
المشاحن المذكور فى الحديث صاحب البدعة التارك للجماعة-
হাদীস শরীফে যে “মুশাহিন” শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে- এর অর্থ হলো বেদাতীগণ, যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত হতে বহি®কৃত হয়েছে। এই বেদআত পন্থী ৭২ ফেরকাকে আল্লাহ পাক এ রাত্রিতে মার্জনা করবেন না। অলীকুল সম্রাট গাউসূল আজম বড়পীর শেখ সৈয়্যদ আবূ মুহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী (র:) “গুনিয়াতুত্ত্বালেবীন” নামক কিতাবে শায়েখ আবু নছর সনদ পরস্পরায়, -আমীরুল মোমেনীন মাওলা আলী (রা:) হতে একই ধরনের হাদীস উল্লেখ করে- বর্ণনা করেছেন যার ভাবার্থ প্রায় একই ধরনের।

দলীল নং-০২
عن معاذ رضى الله عنه : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: يطلع الله فى ليلة النصف من شعبان الى السماء الدنيا فيغفر لجميع خلقه الا لمشرك او مشاحن
হযরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা:) বলেন, মধ্য শাবানের রাত্রিতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে জালওয়া রাখেন, অত:পর তাঁর সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু মুশরিক বা শত্রুতা পোষনকারী ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না। (ইমাম বায়হাকী “শুয়াবুল ঈমান” এর হাদীস নং-৩৮৩৩)
এছাড়াও হাদীসটি যেসব গ্রন্থে বর্ণিত আছে- ইমাম ইবন্ হিব্বান এর সহীহ “ইবন হিব্বান” এর হাদীস নাম্বার ১৯৮০, পৃষ্ঠা-৩৫৫, খন্ড-১৩।
আহলে হাদীস তথা লা-মাযহাবীদের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি নাসির উদ্দিন আলবানীর “সিলসিলাতুল আহাদিস আসসাহীহা”এর ৩য় খন্ড, ১৩৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং-১১৪৪। ইমাম তাবারানী তার বিখ্যাত কিতাব “মুজামুল কাবীর” এর ১৫ খন্ড, ২২১ পৃষ্ঠা। “ফাজায়েলুল আওকাত” এর হাদীস নং-২২, পৃষ্ঠা-১১৯। “আত তারগীব ওয়াত তারহীব” এর ২য় খন্ড ২৪১ পৃষ্ঠা। “মাজমাউয যাওয়ায়েদ” এর ৮ম খন্ড ৬৫ পৃষ্ঠা। “আল হিলয়াহ” এর ৫ম খন্ড, পৃ.-১৯১। “আসসুন্নাহ” এর হাদীস নং-৫১২।
উল্লেখ্য যে, বায়হাকী শরীফে বর্ণিত হাদীসটি অন্যান্য ওলামায়ে কেরাম ছাড়াও শবে বরাতের বিরুদ্ধবাদী আলেমও সহীহ হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

দলীল নং-০৩
মশকাত শরীফে ১১৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-
عن عائشة رضى الله عنها عن النبى صلى الله عليه وسلم قال هل تدرين ما فى هذه الليلة يعنى ليلة النصف من شعبان قالت ما فيها يا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال فيها ان يكتب كل مولود بنى ادم فى هذه السنة وفيها ان يكتب كل هالك من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ترفع اعمالهم وفيها تنزل ارزاقهم- فقالت : يا رسول الله ما من أحد يدخل الجنة إلا برحمة الله تعالى؟ فقال : ما من أحد يدخل الجنة إلا برحمة الله تعالى -ثلاثا
উম্মুল মোমেনীন মাহবুবায়ে মাহবুবে রাব্বিল আলামিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন(সা:) হযরত আয়েশা (রা:) কে জিজ্ঞেস করলেন- হে আয়েশা! শাবান মাসের মধ্য রাতের মর্যাদা ও বুযুর্গী সম্পর্কে তুমি কি জান? তিনি আরজ করলেন ইয়া রাসুল (সা:) শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতের কি মর্যাদা রয়েছে? রাসুল (সা:) উত্তরে বললেন- আগামী এক বছরে কতজন আদম সন্তান ভূমিষ্ট হবে এবং কতজন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করবে তা এ রাত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাত্রিতে তাদের আমল মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের রিযিক অবতীর্ণ কিংবা নির্ধারণ করা হয়। অত:পর হযরত আয়েশা (রা:) বললেন, ইয়া রাসুল (সা:) “আল্লাহর রহমত ছাড়া কারো পক্ষে কি জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়? রাসুল (সা:) বললেন, মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত ও একান্ত অনুগ্রহ ছাড়া কারো পক্ষে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। এ কথাটি রাসুল (সা:) তিনবার বললেন। (ফাজায়েলুল আওকাত এর হাদীস নং ২৬ এ হাদীসটি রয়েছে)

গাউসূল আজম শেখ সৈয়্যদ আবদুল কাদের জিলানী (র:) তদ্বীয় “গুনিয়াতুত ত্বালেবীন” নামক কিতাবে উল্লেখ করেন : হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বলেন- আল্লাহর হাবীব রাউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান শাবানের মধ্যবর্তী রাতে হযরত জিব্রাইল (আ:) আমার নিকট এসে বললেন- ইয়া রাসুল (সা:) আজ আপনার মাথা মোবারক আকাশের দিকে উত্তোলন করুন- কেননা আজ বরকতের রাত। আমি জিজ্ঞেস করলাম- কেমন বরকত? উত্তরে হযরত জিব্রাইল (আ:) বললেন- এই রাতে আল্লাহ পাক তিনশত রহমতের দরজা খুলে দেন। মুশরিক, যাদুকর, গণক, সর্বদা মদ্য পাণকারী, ব্যভিচারী এবং সুদখোর ব্যতীত সকলকে আল্লাহপাক ক্ষমা করে দিবেন। (গুনিয়াতুত্বালেবিন- ৫২৭ পৃষ্ঠা)

দলীল নং-০৪
সিহাহ্ সিত্তার অন্যতম হাদীসগ্রন্থ জামে তিরমিজি শরীফ ১ম খন্ড ৯২ পৃষ্ঠায় একটি অধ্যায় রয়েছে باب ما جاء فى ليلة النصف من شعبان সেখানে হযরত উম্মুল মোমেনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রাঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন- এক রজনীতে আমি দয়াল নবী রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিছানায় পেলাম না। এই জন্য তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। তারপর আমি জান্নাতুল বাকীতে গিয়ে নবীজিকে আকাশের দিকে মাথা উঠানো অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি এ ধারণা করছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার উপর অবিচার করেছেন? হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বললেন; আমি এমন ধারণা করিনি, ভেবেছিলাম আপনি আপনার অন্য কোন বিবির নিকট গমন করেছেন। তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমালেন নিশ্চয় আল্লাহ পাক শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত্রে প্রথম আকাশে তাজাল্লী ফরমান- অত:পর তিনি (আল্লাহ জাল্লাশানুহু) বনী কালব গোত্রের:মেষের পশম সমূহের চেয়েও বেশী লোকের গুনাহ ক্ষমা করেন।” উল্লেখ্য যে, এই বনী কালব এর মেষের সংখ্যা ছিল ৩০,০০০।
এছাড়াও হাদীসটি যেসব গ্রন্থে বর্ণিত আছে-
“মুসনাদে আহমদ” ১৮তম খন্ড, পৃ.-১১৪, হাদীস নং-২৫৯৬, (২১ টি হাদীস রয়েছে)। “মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা” ১০ম খন্ড, পৃ.-৪৩৮, হাদীস নং-৯৯০৭। “শরহুস্সুন্নাহ” ৪র্থ খন্ড, পৃ.-১২৬, হাদীস নং-৯৯২। “আত তারগীব ওয়াত তারহীব” ৪র্থ খন্ড, পৃ.-২৪০, হাদীস নং-২৪। “আল মুনতাখাব মিনাল মুসনাদ” ১ম খন্ড, ১৯৪ পৃষ্ঠা।)

দলীল নং-০৫
সিহাহ্ সিত্তার অন্যতম হাদীসগ্রন্থ ইবনে মাজাহ শরীফের ১০০ পৃ: এবং মিশকাত শরীফের ১১৫ পৃষ্ঠায় আমীরুল মোমেনীন, শেরে খোদা, মুশকিল কোশা হযরত আলী (ক:) হতে মারফু মুত্তাছিল সনদে রেওয়ায়েত করেন- যে, রাসুল (সা:) এরশাদ ফরমান-
اذا كانت ليلة النصف من شعبان- فقوموا ليلها وصوموا يومها فان الله تعالى ينزل فيها لغروب الشمس الى السماء الدنيا- فيقول الا من مستغفرلى فاغفرله الا مسترزق فارزقه الا مبتلى فاعافيه الا كذا كذا حتى يطلع الفجر-
যখন শাবানের ১৫ তারিখের রাত্র আগমন করে তখন তোমরা রাত্র জাগরণ করতঃ মহান আল্লাহ তায়ালার এবাদত বন্দেগী কর এবং এর পূর্ববর্তী দিনে (১৫ তারিখে) রোজা পালন কর। কেননা চৌদ্দ তারিখের সূর্য অস্থ যাওয়া তথা ১৫ তারিখের রাত্র আরম্ভ হওয়ায় সাথে সাথে মহান আল্লাহতায়ালা দুনিয়ার আসমানে স্বীয় তাজাল্লী প্রকাশ ফরমান। অর্থাৎ দুনিয়া বাসীর প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দান করতঃ দয়াপূর্ণ কুদরতী আওয়াজে আহ্বান করে থাকেন। আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আজকের এ পবিত্র রাত্রে আমি আল্লাহর দরবারে নিজের কৃত পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। রুজি-রিজিক চাওয়ার আছ কি? আমি তোমাদের চাহিদা অনুপাতে রিজিক দানের ফয়সালা করে দিব। কোন বিপদগ্রস্থ লোক বিপদ মুক্তির জন্য প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তোমাদের বিপদ দূরীভূত করে দিব। এমন আরো বিষয়ে কেউ প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তা সবই তোমাদেরকে দান করব।
মহান আল্লাহতায়ালার এরূপ করুনাপূর্ণ ঘোষনা সুবহে সাদিক পর্যন্ত চলতে থাকে।
এছাড়াও হাদীসটি যেসব গ্রন্থে বর্ণিত আছে-
“শুয়াবুল ঈমান” ৩য় খন্ড পৃ. -৩৭৯ হাদীস নং-৩৮২২। “মিসবাহুয যুযায” ১ম খন্ড পৃ,-৪৪ হদীস নং-৪৮৬। “মুসনাদে আহমদ” ৬ষ্ঠ খন্ড, ২৩৮ পৃষ্ঠা।

উল্লেখিত বর্ণনা থেকে বোঝা গেল, লাইলাতুল বরাত উদযাপন করার ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। অতএব, ফযিলতের এই রাতে আমরা সকলেই ইবাদতের মধ্যে অতিবাহিত করি, আল্লাহর দরবারে কৃত গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করি, নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি।
আল্লাহ পাক আমাদরকে সহীহ বুঝ ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন, আমীন।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর ....
এক ক্লিকে বিভাগের খবর